বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানী- আল রাজী
আল রাজী (৮৫৪-৯২৫)
৮৫৪
সালে বর্তমান ইরানের রাজধানী তেহরানের নিকটবর্তী আলবোর্জ পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত ‘রে’ শহরে জন্মগ্রহণ
করেন শিশু চিকিৎসার অন্যতম
পথিকৃৎ আবু বকর মুহাম্মদ
ইবনে জাকারিয়া আল রাজী, যিনি
সংক্ষেপে আল রাজী নামে
অধিক পরিচিত। নিজ জন্মস্থান ‘রে’
থেকেই তার নামের পাশে
‘রাজীস’ বা ‘রাজী’ শব্দটি
যুক্ত হয়। তরুণ বয়সেই
তিনি ইরান ছেড়ে ইরাকের
রাজধানী বাগদাদে গমন করেন এবং
সেখানকার একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে বা
হাসপাতালে পড়ালেখার পাশাপাশি হাতেকলমে চিকিৎসাব্যবস্থা রপ্ত করতে থাকেন।
চিকিৎসক হিসেবে সুনাম ছড়িয়ে পড়ায় তার জন্মস্থান
‘রে’ শহরের গভর্নর মনসুর ইবনে ইসহাক সসম্মানে
আল রাজীকে ফেরত আনেন এবং
হাসপাতালসহ সার্বিক চিকিৎসাসেবার গুরু দায়িত্ব প্রদান
করেন। এ দায়িত্ব তিনি
সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে
পালন করেন। ফলে চারদিকে তার
সুনাম আরও বৃদ্ধি পায়।
এ সুনামের কারণে তিনি বাগদাদ থেকে
একটি হাসপাতাল পরিচালনার আমন্ত্রণ পান এবং আমন্ত্রণে
সাড়া দিয়ে বাগদাদ গেলে
তাকে সেখানকার শাসক ‘আল মুতাদিদ’ নিজ
নামে প্রতিষ্ঠিত একটি হাসপাতাল পরিচালনার
দায়িত্ব প্রদান করেন। আল মুতাদিদের পুত্র
আল মুকতাফিও ছিলেন আল রাজীর ভক্ত
ও পৃষ্ঠপোষক। আল মুকতাফি তৎকালীন
আব্বাসীয় সাম্রাজ্যে সর্ববৃহৎ হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা করেন এবং দায়িত্ব
আল রাজীর হাতে তুলে দেন।
আল রাজী হাসপাতালের জন্য
উপযুক্ত স্থান নির্মাণ করার লক্ষ্যে বাগদাদ
শহরের বিভিন্ন এলাকায় পশুর কাঁচা গোশত
ঝুলিয়ে দেন এবং যে
স্থানে গোশত পচতে বা
দুর্গন্ধ ছড়াতে বেশি সময় নেয়
সেখানেই হাসপাতাল নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। তাই বলা
হয়, ‘অ্যাভিডেন্স বেইজড অ্যাপ্রোচ’ বা পর্যবেক্ষণভিত্তিক মতবাদের ভিত্তিতে
যে চিকিৎসা গবেষণা ও বিজ্ঞান ভিত্তিক
কার্যক্রম পরিচালিত হয়, তা আল
রাজীর হাত ধরে বেগবান
হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানসহ
জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আল রাজী অসামান্য
অবদান রাখেন। ২০১৫ সালে ক্লাউডি
ফিলিপস রচিত বইয়ে তাকে
মনোবিজ্ঞান এবং মনোরোগ উপসমে
প্রদত্ত থেরাপির (সাইকো থেরাপি) জনক বলে অভিহিত
করা হয়। ইনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটেনিকার
মতে, আল রাজীই নবম
শতকে গুটিবসন্ত ও হাম রোগ
নির্ণয় এ দুটি রোগের
মধ্যে পার্থক্য ও নিরাময়ের উপায়ের
ওপর ব্যাপক অবদান রাখেন। এ দুটি রোগের
কথা প্রথম ঠাঁই পায় আল
রাজী রচিত ‘আল জুদারি আল
হাসবা’ নামক বইয়ে। তীব্র
মাথাব্যথা বা মিনিনজাইটিস রোগের
ওপর তার মতবাদ চিকিৎসাবিজ্ঞানের
অনন্য সম্পদ। তিনি চিকিৎসা এবং
চিকিৎসাসামগ্রী উৎপাদনের ক্ষেত্রে পারদের ব্যবহার শুরু করেন। মর্টার,
ফাস্ক, গলা দেখার জন্য
চামচের মতো বিশেষ বস্তু
(স্পেটুলাস) এবং ওষুধ সংরক্ষণের
শিশি আবিষ্কার হয় আল রাজীর
হাত ধরে। চিকিৎসকদের নীতি
বা মনোবৃত্তি নিয়ে আজ বিতর্ক
হয়। এ বিষয়ে আল
রাজী হাজার বছর আগেই গুরুত্ব
দিয়েছেন। তার মতে, একজন
চিকিৎসকের উদ্দেশ্য হবে ভালো কাজ
করা এবং শত্রুর প্রতিও
ভালো আচরণ করা। ডাক্তারি
পেশা কারও ক্ষতি করতে
পারে না। মানুষের সেবা
ও কল্যাণই চিকিৎসাশাস্ত্রের ভিত্তি।
আল রাজী রচিত অসংখ্য
বই, মতবাদ, তত্ত্ব, উপদেশ ও অন্যান্য রচনা
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অনন্য সম্পদ। ২৩ খন্ডে রচিত
তার বই ‘আল কিতাব
আল হাওই’ গাইনি ও সার্জারিসহ বিভিন্ন
ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছে। অন্যদিকে সার্বিক চিকিৎসার ক্ষেত্রে ৯ খন্ডে রচিত
‘আল হাওই’ চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইনসাইক্লোপিডিয়া হিসেবে সমাদৃত। শিশুদের অসুস্থতা ও প্রতিকার এবং
মানসিক রোগের ওপরও তিনি বই
লিখেছেন। ইনসাইক্লোপিডিয়ায় তার রচিত ৫০টিরও
বেশি বইয়ের নাম পাওয়া যায়।
পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় আল রাজী রচিত
বই অনুবাদ করা হয়েছে। অন্যদিকে
অ্যাসিডসহ বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ এবং দেহ বা
কোনো বস্তুতে বা পরিবেশে রাসায়নিক
ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ওপর ‘ক্র্যাল ক্যামি’
নামক বিষয়ে তার রচিত আরও
২০টি বইয়ের নাম রয়েছে। দর্শনের
ওপর তার রচিত বইয়ের
সংখ্যা ১৬।
বাগদাদ
ছেড়ে শেষ জীবনে তিনি
নিজ জন্মভূমি ইরানের ‘রে’ শহরে ফিরে
যান। জীবনভর বহু মানুষকে রোগ
থেকে মুক্তি দিলেও শেষ জীবনে তিনি
‘গ্লুকোমা’ নামক জটিল রোগে
আক্রান্ত হন এবং ক্রমেই
তার চোখের আলো নিভে যায়।
এ অন্ধত্বের নেপথ্যে একাধিক কিংবদন্তি রয়েছেন। অসংখ্য ভক্ত, গুণগ্রাহী ও দেশ-বিদেশের
অগণিত ছাত্র-ছাত্রীকে কাঁদিয়ে সত্তরের বেশি বয়সে ৯৩২
সালে (মতান্তরে ৯২৫ সালে) নিজের
জন্মভূমিতেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস
ত্যাগ করেন এবং সেখানেই
তাকে সমাহিত করা হয়।
@collected
@Collected
কোন মন্তব্য নেই
Pls