বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানী- আল জাহারাউই
মানবদেহে
অস্ত্রোপচার (সার্জারি) বা শল্যচিকিৎসা বর্তমান
চিকিৎসাব্যবস্থার এক যুগান্তকারী ঘটনা।
অথচ আজ থেকে হাজার
বছর আগে এ সার্জারির
প্রবর্তন ঘটে মুসলমান চিকিৎসক
ও শল্যবিদ (সার্জন) আবুল কাসেম খালাফ
ইবনে আল আব্বাস আল
জাহারাউই আল আনসারীর হাত
ধরে। চিকিৎসা জগতে আল জাহারাউই
নামেই তিনি অধিক পরিচিত।
বতর্মান স্পেনের (পূর্ববর্তী আন্দালুসিয়া) কর্ডোবা শহরের ৮ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত আজাহারা অঞ্চলে সম্ভাব্য ৯৩৬ সালের পর
জন্ম নেন এই উজ্জ্বল
নক্ষত্র। আল আনসারী খেতাবের
কারণে মদিনায় মহানবী (সা.) এর আমলে
বসবাসরত আনসারদের সঙ্গে তার পূর্বপুরুষের সংযোগ
ও পারিবারিক বন্ধনের বিষয়টি আলোচিত হয়। আবার আরবের
একদল মুসলমান স্পেন বিজয়ের পর সেখানে বসতি
গড়েন এবং আনসার বলে
পরিচিতি পান। তাদের সঙ্গেও
আল জাহারাউইর বন্ধন ছিল বলে ধারণা
করা হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও
সত্য, দীর্ঘদিন এ মুসলিম দিকপালের
তথ্য অনুচ্চারিত ছিল। তার জীবনী
স্মৃতিচিত্র রচনার অনেক কিছুই স্পেন
ও ব্রুনাইয়ের মধ্যে সংঘটিত ‘কাস্টিলিয়ান আন্দালুসিয়ার’ যুদ্ধের সময় ধ্বংস হয়।
ফলে তার শৈশব, কৈশোর,
কর্মক্ষেত্র এবং অর্জন সম্পর্কে
এমনকি তার মৃত্যু নিয়েও
বেশি কিছু জানা যায়নি।
তবে তিনি কর্ম এবং
তার রচিত অসংখ্য বইয়ের
মাঝে অমর হয়ে আছেন।
প্রাপ্ত
তথ্যমতে, জন্মভূমি কর্ডোভার মানুষের সেবায় সারাটি জীবন অতিবাহিত করেছেন
এ মহান চিকিৎসক। এখানেই
তিনি পড়ালেখা করেন, শিক্ষকতা করেন এবং আমৃত্যু
দেশের মানুষের চিকিৎসা বিশেষত, সার্জারি বা অপারেশনে নিজেকে
বিলিয়ে দেন। ৯৬১ সাল
থেকে ৯৭৬ সাল পর্যন্ত
তৎকালীন আন্দালুসের (বর্তমান স্পেন) কর্ডোভা অঞ্চলের শাসক ছিলেন উমাইয়া
সম্রাট মনোনীত দ্বিতীয় আল হাক্কাম। এ
সময় তিনি রাজবংশ এবং
রাজ্যের প্রধান চিকিৎসক ছিলেন।
আল জাহারাউই তৎকালে বৈজ্ঞানিক ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে
আগুনে পুড়ে রোগীর দেহের
জীবাণু কোনো অঙ্গের অনাকাক্সিক্ষত
বর্ধিত অংশ বা ক্ষতিকর
টিস্যু নির্মূলে সাফল্য লাভ করেন এবং
সর্বমহলে প্রশংসিত হন। শরীরের বিভিন্ন
অংশ যেমন- গলা, নাক, কান
এমনকি পেটের ভিতরের কোনো কোনো অঙ্গ
বাহির থেকে দেখার পরীক্ষার
বিভিন্ন যন্ত্র আবিষ্কার করে তিনি সবাইকে
তাক লাগিয়ে দেন। বর্তমানে দেহে
স্যালাইন প্রয়োগ এবং শরীরের ভিতর
থেকে মলমূত্র বা দূষিত রক্ত
বের করার কাজে কেনুলা
নামক প্লাস্টিকের পাইপ বা টিউব
ব্যবহৃত হয়, তারও আবিস্কারক
আল জাহারাউই। আঁচিল, টিউমার বা পায়ের নিচে
শক্ত কর্ণ সার্জিক্যাল যন্ত্র
দিয়ে তিনিই প্রথম অপারেশনের মাধ্যমে কাটার প্রচলন করেন। এক ক্রীতদাসী আত্মহত্যার
উদ্দেশ্যে নিজের গলায় ছুরি চালানোর
পর আল জাহারাউই অপারেশন
করে তাকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্ত
থেকে ফিরিয়ে আনেন। মস্তিষ্কের ভিতর মাথার খুলি
কিংবা মেরুদন্ডের মতো স্পর্শকাতর ও
ঝুঁকিপূর্ণ অঙ্গে সার্জিক্যাল অপারেশনের শুরুও হয় তার হাত
ধরে। দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর তিনি
একাধারে চিকিৎসা করেছেন, সার্জিক্যাল অপারেশন করেছেন। শিষ্যদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ
করিয়েছেন এবং অসংখ্য বই
লিখেছেন। শিষ্যদের তিনি ‘সন্তান’ বলে সম্বোধন করতেন
এবং ডাক্তার ও রোগীর সুসম্পর্কের
ওপর গুরুত্ব দিতেন। তার রচিত ২০
খন্ডের চিকিৎসাবিষয়ক বইয়ের শিরোনাম ‘কিতাব-ই তাশরিফ’।
চিকিৎসার পাশাপাশি বিভিন্ন ওষুধ আবিষ্কার এবং
ওষুধ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও তিনি অসামান্য অবদান
রাখেন। বর্তমান বিশ্বে বহুল আলোচিত সৌন্দর্যচর্চার
রূপকার ছিলেন আল জাহারাউই। এ
বিষয়ে তার লেখা বইয়ের
নাম ‘অদউইয়াত অল জিনাহ’, যার
অর্থ মেডিসিন অব বিউটি বা
সৌন্দর্যের ওষুধ। সুগন্ধির প্রতি তার ছিল দুর্বার
আকর্ষণ। তার হাত ধরেই
বর্তমান পারফিউম, আতর বডি স্প্র্রে,
ধূপকাঠি, আগরবাতি এমনকি লিপস্টিকের আদি রূপ আবিষ্কৃত
হয়।
শরীরের
রগ নিয়ে অপারেশন পরবর্তী
সেলাইর প্রচলন করেন আল জাহারাউই।
জন্মগত রোগ এবং অস্বাভাবিক
গর্ভধারণের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অগ্রপথিক।
তিনিই প্রথম প্যারালাইসিস রোগের মূল কারণ নির্ণয়ে
সাফল্য লাভ করেন। চোখের
ছানি অপারেশন এবং বর্তমান বিশ্বে
বহুল প্রচলিত সিজারিয়াল অপারেশনের জন্য সার্জিক্যাল যন্ত্রসহ
অসংখ্য চিকিৎসাসামগ্রী বা মেডিকেল আবিষ্কারের
জনক ছিলেন আল জাহারাউই। ব্যক্তিজীবনে
তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক এবং হজরত মুহাম্মদ
(সা.) বর্ণিত রোগ ও প্রতিকারমূলক
ব্যবস্থার প্রতি বিশেষ আগ্রহী। চিকিৎসার ক্ষেত্রে তিনি মহানবী (সা.)-এর উপদেশ বা
বাণী অনুসরণ করতেন। তার মৃত্যু বা
সমাধিস্থল নিয়ে বিশেষ কোনো
তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ধারণা করা
হয় যে, নিজ জন্মভূমি
কর্ডোভাতেই ১০১০ সালে যে
গৃহযুদ্ধ এবং লুটতরাজ হয়,
তার আনুমানিক ২ বছর পর
১০১২ কিংবা ১০১৩ সালে মৃত্যুবরণ
করেন জাতি ধর্ম বর্ণ
নির্বিশেষে সবার প্রিয় চিকিৎসক
এবং চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশেষত সার্জারির দিকপাল আল জাহারাউই।
@Collected

কোন মন্তব্য নেই
Pls